Sunday, 27 October 2019

কে এই মহাকালী ? জানুন এর গোপন তত্ত্ব।

কে এই মহাকালী ? জানুন এর গোপন তত্ত্ব।


অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাংলা কবি এবং মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীর পরে যিনি আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম প্রর্বত্তক রামপ্রসাদ সেন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান তিন উপাসনার ধারা শাক্ত, শৈব এবং বৈষ্ণব এ তিনমতের সমন্বয়ের অন্যতম অগ্রনায়ক ছিলেন। কৃষ্ণ কালীকে তিনি একসাথেই উপাসনা করেছেন। তাঁর কাছে কৃষ্ণ এবং কালী ছিলো একই ব্রহ্মের পুরুষ ও প্রকৃতির অভেদ রূপ। শ্রীমদ্ভাগবতের পঞ্চম স্কন্ধেও কৃষ্ণ-কালীর অভেদ বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দর করে বর্ণনা করা আছে-


ন বা এতদ্বিষ্ণুদত্ত মহদদ্ভুতং যদসম্ভ্রমঃ
স্বশিরশ্চ্ছেদন আপতিতেঽপি বিমুক্ত-
দেহাদ্যাত্মভাবসুদৃঢ়হৃদয়গ্রন্থীনাং সর্বসত্ত্ব-
সুহৃদাত্মনাং নির্বৈরাণাং সাক্ষাদ্ভগবতা-
নিমিষারিবরায়ুধেনাপ্রমত্তেন তৈস্তৈর্ভাবৈঃ
পরিরক্ষ্যমাণানাং তৎপাদমূলমকুতশ্চি-
দ্ভয়মুপসৃতানাং ভাগবতপরমহংসানাম্ ॥
(শ্রীমদ্ভাগবত : ৫.৯.২০)


"ভগবান স্বয়ং ভদ্রকালী প্রভৃতি বিভিন্ন রূপ ধারণ করে এসে সাধুদের রক্ষা করেন। যার দেহাভিমানরূপ হৃদয়গ্রন্থি ছিন্ন হয়ে গেছে, যিনি সমস্ত প্রাণীজগতের সুহৃৎ, যিনি কারাের প্রতি বৈরী ভাব পােষণ করেন না, তাদের স্বয়ং ভগবান বিভিন্ন রূপ ধারণ করে রক্ষা করেন ; তাই ভগবানের শরণাগত নির্ভয় ভগবদ্ভক্ত পরমহংসগণ নিজের শিরচ্ছেদনের সময়েও বিচলিত হবেন না, এটাই স্বাভাবিক।"
সমস্যা বাধে তখনই , যখন আমরা যার যার ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে যে যে মতাবলম্বী সবাইকে সেই সেই মতাবলম্বী বানাতে চাই। আমরা ভুলে যাই বেদান্ত দর্শনের চার নং সূত্র-
তত্তু সমন্বয়াৎ।। (১.১.৪) এই সূত্রকে। এই সূত্রেই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে বিভিন্ন মত-পথ নির্বিশেষে সকল মত-পথই ব্রহ্ম লাভ এবং উপলব্ধির এক একটি পন্থা।
বাঙালি হিন্দুরা প্রধানত আমরা শাক্ত, শৈব এবং বৈষ্ণবের মিশ্র উপাসক। আমাদের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা এবং প্রধান তিথিকৃত্য জন্মাষ্টমী ও শিবচতুর্দশী। একই মন্দিরে আমাদের কৃষ্ণ থাকে, কালী থাকে, দুর্গা থাকে এবং শিবসহ আমাদের পঞ্চমতের সকল উপাস্য থাকে। এই সমন্বয় এবং সমন্বয়ে আবহে উৎপাদিত সংগীত-নৃত্যকলা সহ সকল শৈল্পিক সৃষ্টিশীলতাই আমাদের বাঙালি জীবনের অক্ষয় ভাব সম্পদ। সেই সমন্বয়ের ভাবসম্পদের রত্নভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন শ্রীরামপ্রসাদ সেন। তাঁর লেখা অক্ষয় রত্নতুল্য একটি সমন্বয় সংগীত হলো-

"মন করোনা দ্বেষাদ্বেষি।
যদি হবিরে বৈকুণ্ঠবাসী।।
আমি বেদাগম পুরাণে, করিলাম কত খোঁজ- তালাসি।
ঐ যে কালী, কৃষ্ণ, শিব, রাম, সকল আমার এলোকেশী।
শিবরূপে ধর শিঙ্গা, কৃষ্ণরূপে বাজাও বাঁশী
ওমা রামরূপে ধর ধনু, কালীরূপে করে অসী।।
দিগম্বরী দিগম্বর, পীতাম্বর চিরবিলাসী।
শ্মশানবাসিনী বাসী, অযোধ্যা গোকুলনিবাসী।।
ভৈরবী ভৈরব সঙ্গে, শিশু সঙ্গে এক বয়সী।
যেমন অনুজ ধানুকী সঙ্গে জানকী পরম রুপসী।।
প্রসাদ বলে ব্রহ্ম নিরুপণের কথা দেঁতোর হাসি।
আমার ব্রহ্মময়ী সর্বঘটে, পদে গঙ্গা গয়া কাশী।।"


কিন্তু ইদানীং কিছু হিন্দু সংগঠনের বিভেদ সৃষ্টিকারী প্রচারণা খুবই দুঃখজনক। তারা যেভাবে বিভেদ সৃষ্টিকারী দাস-দাসী তত্ব নিয়ে সদা ব্যস্ত, এতে তাদের কতোটুকু লাভ হয় জানি না, কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের অনৈক্যের, বিদ্বেষের জাল আরো দৃঢ় হয়। দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজা আসলেই তারা তাদের হাস্যকর দাস-দাসী তত্ব নিয়ে এসে হাজির হয় এবং বিভেদ সৃষ্টি করে তোলে।
এ প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারীর লেখা জগজ্জননী কালীমাতার তত্ত্ব নামক একটি ছোট্ট বইতে ব্রহ্মচারীজী শাক্ত বৈষ্ণব মিলনের একটি অসাধারণ রেফারেন্স দিয়েছেন বৈষ্ণব শিরোমণি ষড় গোস্বামীর অন্যতম শ্রীজীব গোস্বামীর লেখা থেকে (পৃষ্ঠা -১১)।
যঃ কৃষ্ণঃ সৈব দুর্গা স্যাৎ
যা দুর্গা কৃষ্ণ এব সঃ।
যে কৃষ্ণ, সেই দুর্গা এবং যিনি দুর্গা তিনিই কৃষ্ণ।


যেই শ্যাম, সেই শ্যামা। যেই ব্রহ্ম, সেই শক্তি; যেই লক্ষ্মী, সেই নারায়ণ ; যেই শিব, সেই শক্তি ; যেই রাধা, সেই কৃষ্ণ। একই সত্ত্বার শুধুমাত্র প্রকাশ বিভিন্ন। আর আমরা এই দৃশ্যমান বিভিন্নতায় মায়ার প্রভাবে বিভ্রান্ত হয়ে যাই।
'ব্রহ্ম-শক্তি'র অভেদ-তত্ত্বটি বোঝাতে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁর শ্রীম লিখিত কথামৃতে বলেছেন-
''ব্রহ্ম আর শক্তি অভেদ, এককে মানলেই আর-একটিকে মানতে হয়। যেমন অগ্নি আর তার দাহিকাশক্তি; ... অগ্নি মানলেই দাহিকাশক্তি মানতে হয়, দাহিকাশক্তি ছাড়া অগ্নি ভাবা যায় না; আবার অগ্নিকে বাদ দিয়ে দাহিকাশক্তি ভাবা যায় না। সূর্যকে বাদ দিয়ে সূর্যের রশ্মি ভাবা যায় না।"
"আদ্যাশক্তি লীলাময়ী; সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় করছেন। তাঁরই নাম কালী। কালীই ব্রহ্ম, ব্রহ্মই কালী! একই বস্তু, যখন তিনি নিষ্ক্রিয় - সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় কোন কাজ করছেন না -এই কথা যখন ভাবি, তখন তাঁকে ব্রহ্ম বলে কই। যখন তিনি এই সব কার্য করেন, তখন তাঁকে কালী বলি, শক্তি বলি। একই ব্যক্তি নাম-রূপভেদ। ''
এই ব্রহ্ম ও শক্তি এবং শ্যাম ও শ্যামা বা কালী-কৃষ্ণের অভেদ তত্ত্বকেই কবি নজরুল ইসলাম তার অনন্য অসাধারণ একটি সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

"শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে
জপি আমি শ্যামের নাম।
মা হলেন মোর মন্ত্রগুরু
ঠাকুর হলেন রাধাশ্যাম॥
ডুবে শ্যামা-যমুনাতে
খেলব খেলা শ্যামের সাথে।"


আজ ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের লক্ষ্যে শ্যাম ও শ্যামার যুগ্ম আরাধনায় সকল বাঙালি উজ্জীবিত এবং জাগরিত হয়ে উঠুক এই প্রার্থনা এবং প্রচেষ্টায় আমাদের সবার ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ করা উচিত।
এ শ্যাম-শ্যামার অভেদ ব্রহ্মচিন্তায় আমাদের ভুলে যেতে হবে, সকল প্রকার বিদ্বেষ এবং বিদ্বেষপূর্ণ দাসদাসীতত্ত্ব। সাধারণত গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণই এ দাসদাসী তত্ত্বের ব্যবহার বেশী করেন। কিন্তু তারা হয়তো অনেকেই জানেন না, তাদের অন্যতম পবিত্র গ্রন্থ শ্রীচৈতন্য ভাগবতে অত্যন্ত সুন্দর করে ব্রহ্মস্বরূপা আদ্যাশক্তির স্তোত্র করা আছে। নবদ্বীপে চন্দ্রশেখরের গৃহে শ্রীচৈতন্যদেবকে উদ্দেশ্য করে নিত্যানন্দ সহ সকল পার্ষদেরা এ অনন্য আদ্যাশক্তি স্তোত্রটি করে।

"জগৎস্বরুপা তুমি তুমি সর্বশক্তি।
তুমি শ্রদ্ধা দয়া লজ্জা তুমি বিষ্ণুভক্তি।।
যত বিদ্যা সকল তোমার মূর্তিভেদ।
সর্ব প্রকৃতির শক্তি তুমি কহে বেদ।।
নিখিল ব্রহ্মাণ্ডগণের তুমি সর্বমাতা।
কে তোমার স্বরূপ কহিতে পারে কথা।।
তুমি ত্রিজগতহেতু গুণত্রয়ময়ী।
ব্রহ্মা আদি তোমারে নাহি জানি কেহি।।
সর্বাশ্রয়া তুমি সর্বজীবের বসতি।
তুমি আদ্যা অবিকারা পরমপ্রকৃতি।।
জগতজননী তুমি দ্বিতীয়রহিতা।
মহীরূপে তুমি সর্ব জীবপাল মাতা।।
জলরূপে তুমি সর্বজীবের জীবন।
তোমা সঙরিলে খণ্ডে অশেষ বন্ধন।।
সাধুজন-গৃহে তুমি লক্ষ্মী মূর্তিমতী।
অসাধুর ঘরে তুমি কালরূপাকৃতি।।
তুমি সে করাহ জগতের সৃষ্টি স্থিতি।
তোমা না ভজিলে পায় ত্রিবিধ দুর্গতি।।"
(শ্রীচৈতন্য ভাগবত, মধ্যখণ্ড,১৮শ অধ্যায়)


স্তোত্রটিতে দেবীকে জগৎস্বরূপা, সর্বশক্তিস্বরূপা এবং সকল জীবের মাতা সহ ঈশ্বরের সকল বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়েছে। কোথাও একবারের জন্যেও তাঁকে কৃষ্ণের দাসি বলা হয়নি। এরপরেও আমরা দেখি কিছু বৈষ্ণবেরা দাস-দাসী তত্ত্ব তোতাপাখির মতো প্রতিনিয়ত আওড়ে যান!
আমাদের স্মরণে, মননে এবং জীবনে শ্যাম-শ্যামার অভেদ তত্ত্ব প্রতিফলিত করে যখন আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারবো, তখনই হবে আমাদের সার্থক দীপাবলি। পবিত্র দীপান্বিতা_অমাবস্যার দীপের আলোক আমাদের প্রোজ্জ্বল করে মনের সকল পঙ্কিলতাকে নাশ করুক এ কামনা প্রতিনিয়ত।

ত্বং জ্যোতিঃ শ্রী রবিশ্চন্দ্রো বিদ্যুৎসৌবর্ণতারকাঃ।
সর্ব্বেষাং জ্যোতিষাং জ্যোতি-দীপজ্যোতিঃস্থিতে নমঃ।।


হে জ্যোতির্ময়ী লক্ষ্মী, তুমি সূর্য ,চন্দ্র, বিদ্যুৎ, সুবর্ণ, নক্ষত্রসহ সকল জ্যোতি পদার্থের একমাত্র জ্যোতি। সর্বত্র বিরাজিতা হে মা, তুমি এই দীপের আলোর মাঝেও প্রত্যক্ষরূপে আছো ; তোমায় প্রণাম।
সবাইকে শ্রীশ্রীশ্যামাপূজা এবং দীপাবলির শুভেচ্ছা!

কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: