Monday, 25 March 2019

পরমাত্মা ও জীবাত্মা মধ্যে সম্পর্ক। জানুন ও পরমাত্মা পথে চলুন।

পরমাত্মা ও জীবাত্মা মধ্যে সম্পর্ক। জানুন ও পরমাত্মা পথে চলুন।

ওঁ দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায় সমানং বৃক্ষং পরিষস্বজাতে।
তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদ্বত্তি-অনশ্নন্নন্যো অভি চাকশীতি।।
(ঋগ্বেদ ১/১৬৪/২০)

অনুবাদঃ— সুন্দর পক্ষবিশিষ্ট সম সম্বন্ধযুক্ত দুইটি পক্ষী মিত্র রূপে একই বৃক্ষ আশ্রয় করিয়া আছে। তাহাদের মধ্যে একটি বৃক্ষের ফলকে স্বাদের জন্য ভক্ষণ করে এবং অন্যঢী ফলকে ভক্ষণ না করিয়া সব দিক দেখিতে থাকে।


ভাবার্থঃ— বৃক্ষটি শরীর এবং দুইটি পক্ষীর একটি জীব, অন্যটি ব্রহ্ম বা পরমাত্মা। জীব ও ব্রহ্ম উভয়ই অনাদি। উভয়ই সখা স্বরূপ। জীব সংসারে পাপ পুণ্যের ফলভোগ করে এবং ব্রহ্ম ফল ভোগ না করিয়া সাক্ষী রূপে বর্ত্তমান।

আত্মা পরমাত্মা ও জীবাত্মা এই দুটি কি রকমঃ—

আত্মা ও জীবাত্মা এই দুই ধরেই যাবৎ খেলা। আত্মা কে আত্মা ও বলে , আবার পরমাত্মাও বলে। ব্রহ্ম জ্ঞানীর ব্রহ্ম , যোগীর আত্মা ও ভক্তের ভগবান — এ তিনটি এক জিনিস ও একের নাম ; বৃহৎ অগ্নি থেকে যেমন গণনাতীত অগ্নি কণা বা ফিনকির সৃষ্টি, তেমনি আত্মা বা পরমাত্মা থেকে জীবাত্মাদের সৃষ্টি। এক পরমাত্মা নিজের মহা শক্তি মায়ার প্রভাবে কোটি কোটি নানা জাতির, আকৃতি গুনের ও বর্ণের জীবাত্মা রূপে পরিণত বা তাদের সৃষ্টি কর্তা।
জীবাত্মারা পরমাত্মাতেই বিচরণ করছে, তাতেই সৃষ্টি হয়, তাতেই লীন হয়। পরমাত্মার মধ্যে জীবাত্মা কেমন তা উপমা দিয়ে বলি শোন — পরমাত্মা যেন অকূল অপার মহাসাগর। এ সাগরের আদি অন্ত কিছুই নাই।
এ সংসারে জীবাত্মারা কি ভাবে অবস্থিত?
যেমন কোটি কোটি রকমের কোটি কোটি পাত্র এ সাগরের জলে নিমগ্ন। এক একটি জল পূর্ণ পাত্র এক একটি জীবাত্মা।
জীবাত্মাদের মধ্যে কোটি কোটি রকমের শরীর, রূপ আধার পাত্র, তাও ঐ জল থেকেই হয়েছে।
পূর্বেই বলেছি, সুক্ষই স্থুল হয়েছেন — যেমন বাস্প অতি সূক্ষ্ম, ঐ বাস্প থেকে মেঘ, মেঘ থেকে জল কণা, জল কণা থেকে জল বিন্দু, জল বিন্দু থেকে আবার জল আবার জল থেকে বরফ, তেমনি সূক্ষ্ম পরমাত্মা স্থুল হয়ে আধার হয়েছেন, আর ঐ আধারের ভিতরে সে জল রূপ পরমাত্মাই আছেন।
জীবাত্মার জন্ম ও নাই আর মরণ ও নাই।
জল থেকে হয়, জলে থাকে আবার জলেই মিশায়। ঘটের ভিতর জল রূপ যে জীবাত্মা, সেও যেমন ঘট ভাঙলে জলে মিশে যায়, তেমনি ঘট টি ও স্থুল থেকে সূক্ষ্ম হয়ে সে জলে মিশে যায় ।


মরণ কাকে বলে?
ঐ যে ঘট ভেঙে ঘটের জল সাগরে মিশে যায় আর এক ঘটে প্রবেশ করে, ওর নাম মরণ। সূক্ষ্ম যেমন স্থুল হয়, স্থূলও তেমনি সূক্ষ্ম হয় — যেমন বরফ গলে জল, জল থেকে মেঘ বৃষ্টি বাষ্প ইত্যাদি।
এই পরমাত্মাকে সাগরবৎ বললাম, তাও বলা যায়, আবার মহাকাশ ও বলা যায়। বেদে শুনেছি মহাকাশ বলে।

''বেদের আভাস, তুই ঘটাকাশ, ঘটের নাশ কে মরণ বলে।
শুন্যেতে পাপ পুণ্য মান্য গণ্য করে সব খুয়ালে।।''

(শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব)

আত্মা কি, কেমন এবং কি করে?

নিচের বেদমন্ত্র সুন্দর ও সহজ বর্ণনা অর্থাৎ পরমাত্মা ও জীবাত্মা এটাই দ্বৈতবাদের জন্মভূমি।আবশ্য বেদ কথিত তিনটি অজা বা জন্ম রহীত শক্তির মধ্যে একটি প্রেরক বা পরমাত্মা, একটি জীবাত্মা এবং তৃতীয়টি মায়া বা প্রকৃতি। সেই বিচারে দুই আত্মার বর্ণনা যুক্তিযুক্ত।
দ্বা সূপর্না সযুজ্জা সখায়া সমানং বৃক্ষং পরিষস্বজ্জাতে।
তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদ্বত্ত্যনশ্নন্নন্যোহভিচাকশীতি।।
(মুন্ডক উপনিষদ্ ৩/১/১)

অনুবাদঃ— সর্বদা যুক্ত ও পরস্পর সখ্যভাবাপন্ন দুইটি শোভন-পক্ষ পক্ষী একই দেহ-বৃক্ষকে আশ্রয়পূর্বক পরস্পর আলিঙ্গন করিয়া আছে। তাহাদের মধ্যে একজন দেহ-বৃক্ষের বিচিত্র আস্বাদযুক্ত ফল ভোজন করে, অপরটি কিছু ভক্ষণ না করিয়া কেবল দর্শন করে।
আত্মা স্বরূপ কীরূপ?
ওঁ অভি প্রর গোপতিং গিরেন্দ্রমর্চ যথাবিদে।
সূনুং সত্যস্য সৎপতিম্।
(ঋগ্বেদ ৮/৬৯/৪)


অনুবাদঃ— হে মনুষ্য! যথার্থ জ্ঞান লাভের জন্য ইন্দ্রিয়ের স্বামী আত্মাকে বাণী দ্বারা পূজা কর। আত্মা সত্যের পুত্র এবং সত্যের পালক।

ওঁ ন জায়তে ম্রিয়তে বা বিপশ্চিন্নায়ং কুতশ্চিন্ন বভূব কশ্চিৎ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।। (১৮)


হন্তা চেন্মন্যতে হন্তুহতশ্চেন্মন্যতে হতম্।
উভৌ তৌ ন বিজানীতো নায়হন্তি ন হন্যতে।। (১)
(কঠোউপনিষদ্ ১/২/১৮-১৯) (গীতা ২/১৮-২০)


অনুবাদঃ— নিত্য জ্ঞানস্বরূপ আত্মা জন্ম নেন না অথবা মারেন না ইনি না করো থেকে সঞ্জাত হয়েছেন না কোনো কিছু হয়েছে অর্থাৎ ইনি কোনো কিছুরই কার্য-কারণ নন ইনি অজাত নিত্য চিরন্তন, সর্বদা একরস (আর) পুরাতন অর্থাৎ ক্ষয় -বৃদ্ধিরহিত শরীরের নাশ হলেও (আত্মাকে) নাশ করা যায় না। (১৮)
যদি হত্যাকারী ব্যক্তি তাঁকে মারতে সমর্থ মনে করে যদি নিহত ব্যক্তি নিহত হয়েছি মনে করে তারা উভয়েই জানে না এই আত্মা কাউকে মারেন না কারো দ্বারা হতও হন না। (১৯)
ওঁ দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায়া সমানং বৃক্ষ পরিষস্বজাতে।
তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদ্বত্ত্যনশ্নন্নন্যো অভিচাকশীতি।। 
(মূণ্ডকোপনিষদ্ ৩/১/১), (ঋগ্বেদ ১/১৬৪/২০), (অথর্ববেদ ৯/১৪/২০ তেও এই মন্ত্র এইরূপে উপলব্ধ)


অনুবাদঃ— একসাথে অবস্থানকারী পরস্পর সখ্যভাব-পোষণকারী দুটিটি পক্ষী (জীবাত্মা ও পরমাত্মা) একই বৃক্ষের আশ্রয় নিয়ে থাকেন দুজনের মধ্যে একজন ওই বৃক্ষের সুখ-দুঃখরূপ কর্মফলের স্বাদ নিয়ে কিন্তু অন্য না খেয়ে কেবল দেখেন।

ওঁ অঙ্গুষ্ঠমাত্রো রবিতুল্যরূপঃ সংকল্পাহংকারসমন্বিতো যঃ।
বুদ্ধের্গুণেনাত্মগুণেন চৈব আরাগ্রমাত্রো হ্যপরোহপি দৃষ্টঃ।।(৮)


বালাগ্রশতভাগস্য শতধা কল্পিতস্য চ।
ভাগো জীবঃ স বিজ্ঞেয়ঃ স চানন্ত্যায় কল্পতে।। (৯)


নৈব স্ত্রী ন পুমানেষ ন চৈবায়ং নপুংসকঃ।
যদ্ যচ্ছরীরমাদত্তে তেন তেন স যজ্যুতে।। (১০)


সংকল্পনস্পর্শনদৃষ্টিমোহৈর্গ্রাসাম্বুবৃষ্ট্যা চাত্মবিবদ্ধিজন্ম।
কর্মানুগান্যননুক্রমেণ দেহী স্থানেষু রূপাণ্যভিসম্প্রপদ্যতে।। (১১)
(শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ ৫/৮-১১)


অনুবাদঃ— যিনি অঙ্গুষ্ঠমাত্র পরিমাণস্বরুপ সূর্যতুল্য প্রকাশস্বরূপ তথা সংকল্প এবং অহংকারযুক্ত বুদ্ধির গুণের কারণে এবং নিজ গুণের কারণে ই সুঁচের অগ্রভাগের ন্যায় সূক্ষ্ম আকারবান এইরূপ অপর (অর্থাৎ পরমাত্মা ভিন্ন জীবাত্মা) ও নিঃসন্দেহে (জ্ঞানিগণ কর্তৃক) দৃষ্ট।। (৮)
চুলের ডগার অগ্রভাগের শতভাগের পুনরায় শতভাগের কল্পনা করলে যে একভাগ হয় সে (তার বারবার) জীবাত্মা স্বরূপ জানা উচিত এবং সে অসীম ভাব যুক্ত হতে সমর্থ।। (৯)
এই জীবাত্মা না তো স্ত্রী না পুরুষ এবং না ইনি নপুংসক তিনি যে যে শরীর গ্রহণ করেন সেই সেই শরীর দ্বারা সম্বন্ধ যুক্ত হন।। (১০)
সংকল্প, স্পর্শ, দৃষ্টি এবং মোহে তথা ভোজন, জলপান এবং বর্ষাদ্বারা ( প্রাণীগণের) সজীব শরীরের বৃদ্ধি এবং জন্ম হয় এই জীবাত্মা ভিন্ন ভিন্ন লোকে কর্ম অনুসারে লব্ধ ভিন্ন ভিন্ন শরীর ক্রমানুসারে বারংবার প্রাপ্ত হন।। (১১)
আত্মা সম্পর্কে আরো রেফারেন্স নিচে দেওয়া হল।
(শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ ৩/৮), (যজুর্বেদ ৩১/১৮) এরূপ বর্তমান), (গীতা ২/১৯-৩০)।।
পরমাত্মা স্বরূপ কীরূপ?
পরমাত্মা এক, তিনি ছাড়া কেহই দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম বা দশম ঈশ্বর বলে অভিহিত হয় না। যিনি তাঁকে শুধু এক বলে জানেন তিনিই তাঁকে প্রাপ্ত হন।
( অথর্ববেদ ১৩/৪/২)
এক সত্তা পরব্রহ্মকে জ্ঞানীরা ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, অগ্নি, দিব্য, সুপর্ণ, গরুৎমান, যম, মাতরিশ্বা অাদি বহু নামে অভিহিত করেন।
(ঋগ্বেদ ১/১৬৪/৪৬)
পরমাত্মা সর্বব্যাপক, সর্বশক্তিমান শরীর রহিত, রোগ রহিত, জন্ম রহিত, শুদ্ধ, নিষ্পাপ, সর্বজ্ঞ, অন্তর্য্যামী, দুষ্টের দমন কর্তা ও অনাদি। তিনি তাঁহার শাশ্বত প্রজা জীবের অন্য যথাযথা ফলের বিধান করেন।
(যজুর্বেদ ৪০/৮)
সকল বেদ যে পরম পদের বার বার প্রতিপাদন করেছেন এবং সকল তপস্যা যে পদের কথা বলে অর্থ্যাৎ যাঁকে পাবার সাধনার কথা বলে যাঁকে পাবার জন্য সাধকগণ ব্রহ্মচর্যের পালন করেন সেই পদ তোমাকে (আমি) সংক্ষেপে বলছি (সে হচ্ছে) ওঁ এই।
(কঠোপনিষদ্ ১/২/১৫)
(শুদ্ধ) মন দ্বারা এই পরমাত্মা তত্ত্ব প্রাপ্তি-যোগ্য এই জগতে(এক পরমাত্মার অতিরিক্ত) ভিন্ন-ভিন্ন ভাব কিছুই নেই (এজন্য) যে এই জ্গতে বিভিন্ন প্রকার দেখে সেই ব্যক্তি মৃত্যু থেকে মৃত্যুতে গমন করে অর্থাৎ বারবার জন্মায় এবং মরে।
(কঠোপনিষদ ২/১/১১)
ইনি ব্রহ্মা, ইন্দ্র, প্রজাপতি এই সমস্ত দেবতা তথা এই পৃথ্বী বায়ু, আকাশ, জল এবং তেজ এইরুপ এই পাঁচ মহাভূত এবং এই ছোট ছোট সম্মিলিত ন্যায় বীজরূপ সমস্ত প্রাণী এবং এ সমস্ত থেকে ভিন্ন অন্য ও অণ্ডজসমূহ এবং জরায়ুজ তথা স্বেদজ এবং উদ্ভিদ তথা ঘোড়াগুলি গোসমূহ হস্তিসমূহ মানবগণ যা কিছু এই জগৎ এবং যা ডানাবিশিষ্ট এবং জঙ্গম এবং স্থাবর প্রাণিসমুদয় তা সমস্ত প্রজ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মাতেই প্রতিষ্ঠিত ব্রহ্মণ্ড প্রজ্ঞানস্বরুপ পরমাত্মা থেকেই জ্ঞানশক্তিসম্পন্ন প্রজ্ঞানস্বরুপ পরমাত্মাই এইসবের স্থিতির অাধার এই প্রজ্ঞানই ব্রহ্ম।
(ঐতরেয়োপনিষদ ৩/১/৩)
যাঁর মধ্যে সমস্ত দেবগণ ভালোভাবে স্থিত সেই অবিনাশী পরব্যোমে সম্পূর্ণ বেদ বিদ্যমান যে মানুষ তাঁকে জানে তারা এতে সম্যকরূপে অবস্থিত। (শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ ৪/৮), (ঋগ্বেদ মণ্ডল ১ সূত্র ১৬৪-র ৩৯ নং), (অথর্ববেদের ৯/১৫/১৮ তেও পরিলক্ষিত হয়)।
ওই পরমপুরুষ সহস্র মস্তকবিশিষ্ট সহস্র চক্ষুঃবিশিষ্ট এবং সমস্র চরণবিশিষ্ট তিনি সম্পূর্ণ জগৎকে সর্বদিকে আবৃত করে নাভীর ঊর্ধ্বে দশাঙ্গুল পরিমিত হৃদয়দেশে অবস্থিত।
(শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ, ৩/১৪), (যজুর্বেদ ৩১/১), (ঋগ্বেদ ১০/৯০/১), (অথর্ববেদ ১৯/৬/১ তেও পরিদৃষ্ট হয়)।

উপনিষদ্ গঙ্গাতে বলা হয়েছেঃ—
সত্যমেব জয়তে নানৃতং সত্যেন পন্থা বিততো দেবযান।
য়েনাক্রমন্তৃষ্যয়ো হ্যাপ্তকামা যত্র তত্‍ সত্যস্য পরমং নিধানম। (মুন্ডক উপনিষদ ৩.১.৬)


অনুবাদঃ— সত্যের জয় এবং অসত্যের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। সত্যের মাধ্যমে সেই পবিত্র পথ বিস্তৃত যার দ্বারা ঋষিগন পরমসত্যের নিকট গমন করেছেন।



ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি
জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব

শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, চট্টগ্রাম)

শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: