Tuesday, 2 April 2019

বিবাহ। নারী পুরুষের সম্পূর্ণ জীবনের পবিত্র প্রতিশ্রুতি। জানুন ও তা পালন করুন।

হিন্দু বিবাহ রীতি, বিবাহ, বিবাহ মন্ত্র, বিবাহ প্রতিশ্রুতি


অনেকেই মনে করে,বিবাহ মানেই হলো দায় ও গ্যাঞ্জ্যাম। আবার অনেকে এইও মনে করে, এটি একটি ভেজাল, মনমালিন্য ও অনেক বড় বোঝা।একসাথে কাটাতে হবে এবং তাকে ছাড়া কোন গতি নেই। সে আমাকে অস্বীকার করলেও, আমার সাথে তার থাকতে হবে।আবার তার ইচ্ছমত আমার চলতে হবে, তাকে ছাড়া আমার কোন মত নেই। বেশীর ভাগই এইরকম চিন্তাধারীই মনে করেন, বৈবাহিক জীবন মানে স্বাধীনতাহীন বন্দী খাচা।

তাদের উদ্দ্যেশ্যে আমি বলবো,
আমরা সামাজিক প্রানী। প্রাকৃতিক ও পরিবেশের উপর নির্ভর করে আমাদের জীবন যাপনা হয়ে থাকে।আমরা জন্ম নিই, শিশুকাল পেরিয়ে যৌবনে পা রাখি, তখন আমাদের মধ্যে সার্বিক জ্ঞান ও তার পাশাপাশি জৈবিক চাহিদাও এসে যায়। আমরা মানুষ, তাই পশুর মত জীবিকানির্বাহ করতে পারিনা অর্থাৎ তাড়না অনুভব হলে যেখানে সেখানে সব কিছু করতে পারিনা।আমরা নিজের চিন্তাই কেবল করিনা। আমরা আমাদের পরিবার ও তার সম্মানেরও চিন্তা করি। যা পশুরা করেনা। অন্তত এই গুণাবলী র দিক থেকে আমরা পশুর চাইতে উন্নত। যদিও এখন মানুষেরা পশুর চাইতে নিম্নস্তরে পৌছে যাচ্ছে।


আমি সেটা না হয় এখন রাখি, প্রসংগে আসি,
সনাতনধর্ম অনুযায়ী বিবাহ হলো একটি পবিত্র বন্ধন। এখানে বন্ধন হলো সম্পর্ক। সম্পর্ক টা হলো প্রতিশ্রুতি, এটা কোন দ্বায়ভার নয়। এটা ইতিবাচক। একজন আরেকজনের হয়ে যাওয়ার নাম বিবাহ। নিজেকে আরেকজনের আর তাকে আমার করে নেওয়ার নাম বিবাহ বন্ধন।এটা একেবারেই শুদ্ধ একটি সংস্কার ও সমাধান মানব জীবনের। এটার মুল ভিত্তি হলো, বিশ্বাস ও ভালোবাসা।
বিবাহ-মানে দুটো আত্মার মিলন।দুটি আত্মাকে একত্র করার অপর নাম হলো বিবাহ বন্ধন। সনাতনধর্ম মতে বিবাহ বন্ধনের কিছু সুন্দর সুন্দর ও অভাবনীয় নিময় আছে। যা অন্য লোকেরা ও অন্য মতের লোকেরা অন্য ধর্মের লোকেরা দেখলে হিংসা করে..
বিবাহ বন্ধনের অনেক সুন্দর সুন্দর নিয়ম আছে।তার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহামুল্যবান নিয়ম গুলো হলোঃ শুভদৃষ্টি, সাত পাঁকে ঘুরা,মালা বদল, সিঁদুর দান। সমস্ত নিয়মই কিন্ত খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।যা অনেক গভীর রহস্য।


শুভ দৃষ্টি 
শুভ অর্থাৎ ভালো বা মংগলতম আর দৃষ্টি হলো দেখা বা দর্শন করা।ভালোবাসার বন্ধনের প্রথম তম বন্ধন। যখন তাকে দেখে নিজেকে তার মাঝে হারিয়ে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। তার সবকিছুকে নিজের মধ্যে দেখা। সেই সুন্দর তম রুপের দৃষ্টিতে তাকে আজীবন দেখা।সেই দৃষ্টি খুব প্রবিত্র। সমগ্র সংসারের সমস্ত মানুষকে পরিত্যাগ করে, সেই দৃষ্টির মাধ্যমে তাকে আলাদা করে দেখা অর্থাৎ পৃথিবীর সব নারীকে বাদ দিয়ে তুমি কেবল আমার স্ত্রী বা প্রিয়তমা/ পৃথিবীর সকল পুরুষকে বাদ দিয়ে তুমিই কেবল আমার স্বামী বা প্রিয়। এটাই হলো সেই অভাবনীয় সুন্দরতম দৃষ্টি যাকে বলা হয় শুভ দৃষ্টি।
সনাতন ধর্ম মতে বিবাহে আমরা দেখতে পাই,
অগ্নি কুণ্ডলীকে মাঝখানে রেখে চতুর্দিকে বর এবং নববধূকে প্রদক্ষিণ করতে হয়। একে বলে সাত পাঁকে বাঁধা পড়া।
বলা হয়, এর মাধ্যমে অগ্নিদেবতাকে বিয়েতে সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়। শুধু আগুনের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করা নয়, এসময় বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিও দিতে হয় একে- অপরকে।এখানে প্রত্যেক প্রতিশ্রুতিই থাকে সমান অধিকারের,


প্রথম প্রতিশ্রুতি- প্রথমে বর তাঁর বউ এবং সন্তানদের যত্ন নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।বিনিময়ে কনেও প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তাঁর স্বামী এবং তাঁর পরিবারের যত্ন নেবেন।
.
দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি- এবার বর প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তাঁর স্ত্রীকে সবরকম পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করবেন।
বিনিময়ে কনেও প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি স্বামী সবরকম সমস্যায়য় স্বামী পাশে থাকবেন।
.
তৃতীয় প্রতিশ্রুতি- এবার বর প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তাঁর পরিবারের জন্য রোজগার করবেন এবং তাঁদের দেখভাল করবেন। একই প্রতিশ্রুতি কনেও দিয়ে থাকেন।
.
চতুর্থ প্রতিশ্রুতি- স্ত্রীর কাছে তাঁর পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব তুলে দেওয়া এবং একইসঙ্গে স্ত্রীর সমস্ত মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন বর।
স্ত্রী তাঁর সমস্ত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার প্রতিশ্রুতি দেন।
.
পঞ্চম প্রতিশ্রুতি- যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করার প্রতিশ্রুতি দেন বর। স্বামীকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দেন স্ত্রী।
.
ষষ্ঠ প্রতিশ্রুতি- স্ত্রীর প্রতি সত্য থাকার প্রতিশ্রুতি দেন স্বামী। স্ত্রীও স্বামীর প্রতি সত্য থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
.
সপ্তম প্রতিশ্রুতি- শুধু স্বামী হিসেবেই নয়, বন্ধু হিসেবেও
সারাজীবন স্ত্রীর সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন বর।
স্ত্রীও স্বামীর সঙ্গে আজীবন একসাথে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
.

সনাতন বিবাহের মূলমন্ত্র এবং মর্মার্থ :

যদ্যেত হৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম।
যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব।।
.
অর্থাৎ, আমার হৃদয় তোমার হোক; তোমার হৃদয় আমার হোক।আমি আমাকে তোমায় দিলাম,তোমার তোমাকে আমার করলাম।
মালা বদল এই নিয়মের মাধ্যমে সে তার মালা তাকে দেন এবং তার মালা সে নিয়ে বদল করে প্রমান দেন। যে আমি তোমাকে আমার করে নিলাম। আর আমাকে তোমার করে দিলাম।আমার যা আছে সবকিছু তোমার, আর তোমার যা আছে সব কিছু আমার। আমি তোমার তুমি আমার। আমার আগের জীবন থেকে আমি আজ নতুন জীবনে নতুন করে তোমায় নিয়ে বাচার অংগীকার করলাম।
সিঁদুর এইটা হলো সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। আমি তাকে আমার রক্তে(সিদুর প্রতীকে) তার মাথায় দিয়ে রক্তের আবদ্ধে নিজেকে জড়িয়ে নিলাম। আমি প্রতিশ্রুতি দিলাম আমি আমার রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে হলেও তোমায় রক্ষা করে যাবো আজীবন। আমার রক্তের প্রতীকি করে তোমায় আমি আমার জীবনের পুরোটা দিয়ে তোমায় বেধে রাখবো, কখনই ছেড়ে যাবো না। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম।
.

সিঁদুর পড়ানোর মন্ত্র :

ওঁ শিরোভূষণ সিন্দুরং ভর্তারায়ু বিবর্ধনং।
সর্বারত্নাকরং দিব্যং সিন্দুরং পতিগৃহ্যতাম্।।
.
শাঁখা পড়ানোর মন্ত্র :

ওঁ শঙ্খালঙ্কারং বিবিধং চিত্রং বাহুনাঞ্চ বিভূষণম্।
মহোদধিসম্ভূতাঃ সর্বদেবীপ্রিয়া সদা।
শঙ্খ বলয় কন্যাভূষণানাং সদুত্তমম্।।
.
পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
ভালো থাকবেন।
নমস্কার।
হর হর মহাদেব!


By : Avijit Pratap Roy

শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: