Sunday, 29 September 2019

শ্রী চন্ডীতত্ত্ব | অর্গলাস্তোত্র ও তার গূঢ়ার্থ



ছোটবেলা থেকেই আমি ঈশ্বরের কাছে চাওয়ার বিরুদ্ধে। একটু বড় হওয়ার পর যখন সংস্কৃত মন্ত্র গুলোর অর্থ একটু একটু বুঝতে শুরু করলাম তখন দেখলাম বেশীরভাগ দেবদেবীর উদ্দেশ্যে পাঠ্য মন্ত্রগুলির শুরুতে তাঁদের ভূয়সী প্রশংসা করা হয় তুমি অমুক তুমি তুমক, তুমিই সব ইত্যাদি। আর তারপর শেষে গিয়ে শুরু হয় চাওয়ার পালা। ধন দাও, মান দাও, আয়ু দাও, যশ দাও, পুত্র দাও ইত্যাদি ইত্যাদি। খুব রাগ হত তখন। ( কেউ অপরাধ নেবেন না দয়া করে , এ একান্তই আমার অপরিণত মস্তিষ্কের বিচার) দূর্গাপূজোয় অঞ্জলী দেওয়ার সময় আমি আয়ুর্দেহি, যশোঃ দেহি, ভাগ্যং ভগবতী দেহি মে... এসব মন্ত্র পড়তাম না। ফুল হাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতাম। তারপর পুরুত মশাইয়ের মন্ত্র পড়া হয়ে গেলে সবার সাথে ফুল ছুঁড়ে দিতাম মায়ের পায়ে। একটু গর্ব করেই মা কে মনেমনে বলতাম আমার কিছু চাই না... বাড়ির পূজোয় যখন চন্ডীপাঠ, মনে মনে হাসতাম অর্গলা স্তোত্র শুনে। প্রতিটি ছত্রে ছত্রে শুধু চাই চাই। রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও....
.
এমন নয় যে আমার জীবন খুব মসৃণ ভাবে চলেছে, বা জীবনে কোন কষ্টই পাইনি যে মায়ের কাছে কিছু চাইতে হয়নি। বরং উল্টোটাই । যত খারাপ সময় এসেছে আমি মা কে অঞ্জলি দিয়েছি এমন ভাব নিয়ে যেন আমি তার কাছে কৃপা ভিক্ষা করতে আসিনি। এসেছি পুজো দিতে। তিনি তার কর্তব্য ভুলতে পারেন। কিন্তু আমি ভুলিনি। গত বছর অবধি আমি একই ভাবে অঞ্জলি দিয়েছি। শুধু দূর্গাপূজা না। সব পূজোতেই।
.
যাই হোক এত ভনিতা যে কারণে সেটা বলি এখন। ব্রহ্মর্ষি শ্রী শ্রী সত্যদেব এর সাধন সমর বা দেবী মাহাত্ম্য বইটি পড়লাম। অনেকেই পড়েছেন, বইটি পড়ে আমার এত বছরের অনেক ভুল ধারণা ভেঙ্গেছে। তাই এই বইতে অর্গলা স্ত্রোত্রের যে অর্থ করে দেওয়া আছে সেটি সংক্ষেপে সবার সাথে শেয়ার করতে চাই। যারা এখনো বইটি পড়েন নি, তারা পড়লে আমার মত ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন।
.
‘অর্গল’ শব্দের অর্থ খিল। যেমন দরজায় খিল আঁটা থাকলে ঘরে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। তেমনি দেবীমাহাত্ম্য পাঠের আগে অর্গলা স্ত্রোত্র পড়লে বাইরের চিন্তা সাধকের মনে প্রবেশ করে মন কে বিক্ষিপ্ত করে তুলতে পারে না। স্ত্রোত্রের শুরুতে “জয় ত্বং দেবী...” ইত্যাদি বাক্যে দেবীর স্তুতি কীর্তন করা হয়েছে । সেটা সবাই বুঝতে পারবেন।
আলোচনার আসল জয়গা হল - রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি, দ্বিষোজহি” যা এই স্ত্রেত্রে সব মন্ত্রের শেষেই আছে।
.
*রূপং দেহি-
সাধারণ অর্থ - মা! আমায় সুন্দর রূপ, আকৃতি দাও, স্বাস্থ্যবান করো।
গূঢ় অর্থ হল-
১। মা! তোমার রূপটি আমায় দেখতে দাও।
২। মা! জগৎময় যে তোমারই রূপ, আমায় তা বুঝিয়ে দাও।
৩। মা! একমাত্র নিরূপনীয় বস্তু পরমাত্ম, আমাকে তাঁর স্বরূপ বুঝতে দাও।
.
*জয়ং দেহি
সাধারণ ভাবে শোনায় - মা আমায় জয় দাও।
গূঢ় অর্ত -
১। মা! আমি যে সাধন সমরে জয় লাভ করতে পারি।
২। মা! আমি চিত্ত ও ইন্দ্রিয়বৃত্তিকে জয় করতে পারি।
৩। মা! তুমি জয়স্বরূপা!! যেহেতু উপনিষদে আছে “সত্যমেব জয়তে” অর্থাৎ একমাত্র সত্যই
জয়যুক্ত। তাই এখানে জয় আর সত্য সমার্থক ধরা হয়েছে। সত্যের পথে চলা মানে যথার্থ জয়ী হওয়া।
.
*যশো দেহি-
সাধারণ অর্থ - মা ! আমাকে কীর্তিমান করো।
গূঢ অর্থ
১। মা! আমি যে তোমারই সন্তান, সেই যশ আমায় দাও। ২। মা! আমাকে সাধন সমরে জয়ী হবার যশ দাও।
৩। মা! আমাকে যশের ন্যায় নির্মল শুভ্র সত্বগুণ প্রদান কর।
৪। মা! আমাকে নিত্য চিরস্থায়ী যশ (পরমাত্মস্তু) দাও।
.
*দ্বিষোজহি-
সাধারণ অর্থ - মা! আমার শত্রুদের হনন কর।
গূঢ অর্থ
১। মা! আমার কাম ক্রোমাদি রিপুসকল শত্রু কে নাশ কর।
২। মা! আমার সাধনার বিরোধী সকল ভাবসমূহ কে নাশ।
৩। মা! আমার ত্রিবিধি কর্মফল নাশ কর। কারণ কর্মফলের আশাই আমার মুক্তির পথের প্রধান শত্রু।
.
এরপরের শ্লোকটিতে আমার সবচেয়ে বেশি আপত্তি ছিল। সেটি হল-
ভার্যাং মনোরমাং দেহি মনোবৃত্ত্যনুসার
িনীম্”
সাধারণ অর্থে দাঁড়ায় - মা! আমার মনোবৃত্তি অনুসারে চলবে এমন মনোরমা পত্নী আমায় দাও!! আমার খুব রাগ হোত এই ভাবে, মায়ের কাছে কলের পুতুলের মত দম দেওয়া সুন্দরী সহধর্মিনী চাওয়া হচ্ছে কিনা স্বামীর অঙ্গুলিহেলনে উঠবে আর বসবে।
কিন্তু গূঢ় অর্থ হল -
১। মা! আমায় আত্মাভিমুখী ইচ্ছাশক্তি দাও সেই শক্তি যেন আমার মনের প্রিয়তমা হয় এবং আমার চিত্তবৃত্তি যেন সেই শুভ ইচ্ছার অধীন থাকে। জগৎমুখী মনোবৃত্তি যেন না থাকে।
২। মা! আমায় দৈবী প্রকৃতি দাও, সেই প্রকৃতি যেন আমার মনোরমা হয় এবং চিত্তবৃত্তিগুলি যেন তাকে অনুসরণ করে।
অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে পুরো স্ত্রোত্রটিতে যা যা চাওয়া হয়েছে সবই সাধন পথে অগ্রসর হওয়ার প্রার্থনা। আসলে ভক্ত মাত্রই শিশুর মত সরলতা নিয়ে ঈশ্বরের শরণাগত হন। শিশু যেমন মায়ে কাছে আবদার করে, সাধক ও তেমনি কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য মায়ের কাছে পথ প্রদর্শনের আবদার করেন। আসলে ভক্তের ইচ্ছে ও আবদার পূরণের মূল উৎস হল ভগবানের প্রতি তার বিশ্বাস। যার বিশ্বাস যত অটুট, মা তার আবদার রাখতে তত বাধ্য । জোর খাটিয়ে বলতে হবে, দেখি কেমন আমাকে সাড়া না দিয়ে পার!!
.
যাই হোক, চন্ডীপাঠের শুরুতেই এত কামনা করা কি দরকার? আসলে এখানেও ঈশ্বর বুঝিয়ে দিয়েছেন, যে আমরা ডালে ডালে চললে তিনি পাতায় পাতায় চলেন। মানুষ স্বভাবতই বিষয়বিমুগ্ধ, দেহান্তবোধ বিশিষ্ট, বাসনার আগুনে দগ্ধ, সুতরাং প্রথমেই যদি মানুষ বাসনা পূরণ হবার সহজ উপায় দেখতে পায় তবে লোভে আকৃষ্ট হয়ে হলেও তারা মাতৃমুখী তো অন্তত হবে।
.
আসলে ছোট শিশুকে মা যেমন রসগোল্লার মধ্যে লুকিয়ে ঔষধ খাওয়ায়, এই মন্ত্রে ও সাধারণ বিষয়ভোগী মানুষদের মা এইভাবেই লোভ দেখিয়ে সাধন পথে টেনে আনছেন। এভাবে পাঠ করতে করতে যখন সাধকের মন চৈতন্য হয় তখণ আর তার জাগতিক কামনা বাসনা থাকে না।
.
মাতৃকৃপা লাভের আকুলতা যাদের প্রাণে একবার জেগেছে তাদের যে শক্তি প্রয়োজন, অর্গলাস্ত্রোত্র সেই শক্তি যোগায়। আর সেই আধ্যত্মিক শক্তি লাভ করলেই পরবর্তীতে অতি গহন চন্ডীতত্বে প্রবেশ করা সম্ভব। নমষ্কার সবাইকে।



Post By : আদিত্য প্রণয়


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: